"অন্তরালে"
:-মোঃ রাকিবুল ইসলাম রাজু
৩য় তথা শেষ পর্ব
"জানো,অদ্রীতা মেয়েটাও আমার বোনের মতো নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলো।"
কথাগুলো বলতে রাজুর কষ্ট হচ্ছিলো খুব।কিন্তু কথাগুলো তাকে বলতেই হতো।
:-কেন ওরা নিজেদের শেষ করে দিয়েছে?(অধরা)
:-তোমার ভাই যখনই চাইতো,অদ্রীতাকে তখনই ওর বাসায় যেতে হতো।এতে করে অদ্রীতা অতিষ্ট হয়ে উঠেছিলো।পরক্ষনে আমার বোনের কথা ধরে অদ্রীতা তোমার ভাইয়ের ডাক পড়ার পরেও ওর বাসায় যায়নি।পরদিন আমার বোন আর অদ্রীতা ভার্সিটির গেইট দিয়ে বাহির হয়ে আসছিলো,তোমার ভাই হঠাৎ করে কোথায় থেকে এসেই অদ্রীতার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো।আমার বোন নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে না পেরে পায়ের জুতো খুলে সকলের সামনে তোমার ভাইকে জুতো পেটা করে।তোমার ভাই অপমানটা সহ্য করতে না পেরে,আমার বোনকে শাসিয়ে যায়।
যদিও কথা বলতে রাজু কষ্ট হচ্ছিলো,তারপরেও রাজু এক নাগাড়ে কথাগুলো বললো।অধরা,রাজুকে করা আঘাতগুলো ওড়না দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেই রাখলো,আর রাজুর কথাগুলো শুনতে লাগলো।এতক্ষনে রক্তে ওর ওড়নাটাও ভিজে গেছে।
:-জানো অধরা,তোমার ভাই একে তো অদ্রীতা মেয়েটার সাথে অন্যায় করছিলো,তার উপর ঐ দিনের অপমানের কারণে ওর ভিডিওটা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়।মেয়েটা কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না ভেবে নিজেই আত্মহত্যা করে নেয়।(রাজু)
:-তুমি এতকিছু জানলে কি করে?(অধরা)
:-আমার বোন আমাকে সবকিছু খুলে বলেছিলো।এরপর আমি আমার বোনকে কখনো একা একা ছাড়িনি।বেশ কয়েকদিন পর,পরিস্থতি যখন স্বাভাবিক হয়,আমার বোনটা ভার্সিটিতে যাওয়া শুরু করে।একদিন হঠাৎ করে আমার বোন ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরেনি।আমি হন্য হয়ে এদিক-ওদিক সব জায়গায় ওকে খুঁজেছিলাম,কিন্তু কোথাও পাইনি।আর ওর ফোনও বন্ধ ছিলো।থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলাম।পুলিশ বলছে রাতের ভেতরে না আসলো ওরা ব্যবস্থা নিবে।নাহ্,রাতেও আমার বোন আসলো না।পুলিশ বলে কি আমার বোন হয়তো ওর প্রেমিক এর সাথে পালিয়ে গেছে।কিন্তু আমার বোন কারো সাথে রিলেশনে ছিলো না।পুলিশকে সেটা বিস্বাস করাতেই পারিনি।ওরা বলে কি,এই সাধারণ বিষয় নিয়ে ওরা সময় নষ্ট করতে পারবো না।
এইসব বলেই রাজু চোখের পানি ঝরাতে লাগলো।অপরদিকে অধরার চোখ দিয়ে পানির স্রোত বইতে লাগলো।
:-আমি আমার বোনকে খুব বেশীই ভালোবাসতাম।আমি ছাড়া আমার বোনটার কেউ ছিলো না।সেই ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি।মায়ের হাতেই মানুষ হয়েছি আমরা দুই ভাই-বোন।বছর দুয়েক আগে মাকেও হারিয়ে।বিস্বাস করো অধরা,আমি আমার বোনের চোখের পানি সহ্য করতে পারিনা।আর সেই বোন নাকি নিখোঁজ হয়ে গেলো।আমার খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ হয়ে গেছিলো।পাগল হয়েই গেছিলাম ওকে খুঁজতে খুঁজতে।একসময় তোমার ভাইয়ের কথাটা মাথায় আসতেই,আমি বাকিটা বুঝে গিয়েছিলাম।সোজা তোমার বাবার কাছে গিয়ে উনার পায়ে পড়ে থাকি।অনুরোধ করে বলেছিলাম,আমি পুলিশ ঝামেলাম জড়াবো না,এরপর ও আমার বোনকে যেন ফিরিয়ে দেয়।উনাকে বলার কিছুসময় বাদে,সন্ধ্যার দিকে আমার বোন বাসায় আসে।আর ওকে দেখেই আমি,,
এই বলে রাজু হু হু করে কান্না করে উঠলো।
:-কি হইছিলো ওর?(অধরা)
কান্নার জন্য রাজু আর কথা বলতেই পারতেছে না।কান্না করেই যেতে লাগলো।
:-তোমার ভাই অদ্রীতার সাথে যেসব করেছিলো,আমার বোনের সাথেও ওসব করেছিলো।আমি আমার বোনটাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম যে সব ঠিক হয়ে যাবে।আর ও যেন এসব দুঃস্বপ্ন ভেবে মাথা থেকে এসব ঝেড়ে পেলে দেয়।আমার বোনও আমার কথায় সায় দিয়েছিলো।
চোখের পানি মুছে নিয়ে অধরার দিকে তাকালো রাজু।
:-কি হলো তুমি এভাবে কাঁদতেছো কেন?
অধরাকে কাঁদতে দেখে বললো রাজু।
:-এরপর বলো।
রাজুর কথা এড়িয়ে গিয়ে বললো,অধরা।
:-আমি আমার বোনকে ফ্রেশ হতে বলে খাবার প্রস্তুত করার জন্য রান্নাঘরে চলে আসি।কিছুসময় বাদে ওকে ডাকতে ডাকতে ওর রুমে আসি।আর এসেই দেখি আমার বোন আমায় একা করে দিয়ে চলে গেছে।ও ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করে নিয়েছিলো।ও দুই লাইনের একটা চিরকুট ও লিখেছিলো।কি লিখা ছিলো জানো?"ভাইয়া,এসব কখনো ঠিক হওয়ার নয়।ও অদ্রীতার মত আমারও এসবের ভিডিও করে রেখেছে।যখন-তখন ও এসব?আমি আর ভাবতে পারতেছি না।চলে যেতে হচ্ছে তোমায় ছেড়ে।পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও।"
কথাগুলো বলে রাজু আবারও কান্নায় ভেংগে পড়লো।
:-এ আমি কি করলাম?কিছু না জেনে,না বুঝে তোমাকে,,,
হতাশা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বললো অধরা।
:-আমার বোন চলে যাওয়ার পর খুব একা হয়ে পড়ি।আমি চাইলে পুলিশে অভিযোগ করতে পারতাম।কিন্তু লাভ হতো না।তাই আমি তোমার ভাইকে খুন করার চিন্তা-ভাবনা করি।ওইদিন রাতে আমি বাসা থেকে বাহির আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার যা কিছু হয়ে যাক না কেন আমি তোমার ভাইকে খুন করেই ছাড়বো।আমি তোমাদের বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই দেখি কিছু লোক তাড়াহুড়ো করে একটা গাড়িতে করে বাহির হয়ে আসলো।আমি ভাবছিলাম তোমার বাবা বা ভাইয়ের কোন ক্লাইন্ড হবে।আমি আর কিছু না ভেবে ভেতরে প্রবেশ করি।আর দেখি যে উনাদের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে।আর আমি তাড়াহুড়ো করে বাহির হয়ে আসার সময় তোমার সাথে ধাক্কা খাই।
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলেই দীর্ঘশ্বাস পেললো রাজু।
এরপর ওদের মাঝে কিছু সময়ের নিরবতা নেমে আসলো।
:-সবাই এক এক করে আমায় ছেড়ে গিয়ে আমায় একা করে দিয়ে চলে গেছে।এরপর হঠাৎ করে তুমি আসলে আমার জীবনে।জীবনটাকে রঙ্গিন করে তুলেছিলে।তোমায় নিয়ে,,
এতটুকু বলতেই রাজুর আবারও রক্তবমি শুরু হয়ে গেলো।অধরা রাজুকে ধরে সামলাতে লাগলো।
:-তোমাকে নিয়ে কতটা স্বপ্ন বুনেছি এই মনে।আমার একাকিত্ত্বটা ও কাটিয়ে উঠছিলাম আমি।
নিজেকে সামলে নিয়ে বললো রাজু।
অধরা কান্না করেই যেতে লাগলো।
:-এ কি করলাম আমি?কি করলাম?আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও।
কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো অধরা।
:-খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।নিঃশ্বাসটাও কেমন যেন আটকে আসতেছে।
কথাগুলো বলতে রাজুর মুখে কেমন যেন জড়তা চলে আসলো।
:-এই চলো না,তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।(অধরা)
:-তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করতেছে না।খুব বেশী ভালোবেসে পেলছিলাম তোমায়।
লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বললো রাজু।
:-নাহ্,তোমার কিছু আমি হতে দিবো না।
এই বলে অধরা রাজুকে শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো।
:-চলো তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই
জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বললো অধরা।জবাবে রাজুর থেকে কোন সাড়া পেলো না।
:-কি হলো,কিছু বলছো না যে?
জড়ানো অবস্থা থেকে ছেড়ে রাজুর মাথাটা অধরা হাতের তালুতে রেখে বললো।
রাজুর দিকে তাকালো,চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আছে।তাড়াতাড়ি নাকের কাছে হাত নিলো।নাহ্,কোন শ্বাস চলতেছে।রাজুর হাত,পা সব ঠান্ডা হয়ে আসতেছে।অধরার আর বুঝতে বাকি রইলো না,রাজু যে আর নেই।রাজুর প্রাণহীন নিথর দেহটাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলো অধরা।
---------------
(সমাপ্ত)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন